নির্বাচনী সমাবেশ আর রাজনৈতিক মঞ্চেই সীমাবদ্ধ সুজন হত্যার বিচার, গড়ে উঠেনি আন্দোলন

১৯৬৭ সালে রূপসদীর মাটিতে জন্মেছিলেন এক ছেলে। কে জানতো, সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন বদলে দিবে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাস। এখনও এই অঞ্চলের বহু মায়ের প্রত্যাশা তাদের সন্তান যেন হয় সুজনের মতো।
২০০১ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই ঝরে যায় সম্ভাবনাময় সুদর্শন ও সুবক্তা এই ক্ষণজন্মা তরুণের প্রাণ। তিনি প্রথমবার মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয়তাবাদী দলের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য হওয়ার রেকর্ড করেন। বাঞ্ছারামপুরবাসী জাতীয় নেতা হারানোর শোক বহন করছে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে। নির্বাচনী সভা-সমাবেশেই কেবল শোভা পায় সুজন হত্যার বিচারের বাণী, রাজনৈতিক বক্তব্যে কেবর কথার ফুলঝুড়ি হিসেবেই থেকে যান সুজন। কিন্তু বিচারের দাবিতে রাজপথে নামে না কেউ, এখনও গড়ে ওঠেনি কোনো সামাজিক আন্দোলন।
এইতো গেল নির্বাচনের আগেও কত আশ্বাস, কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি এতোদিনেও। বুক ভরা হাহাকারে কেবল নিভৃতে কেদে যান সুজনের মা আর পরিবার। অনেক সময় রাজনৈতিক সমাবেশেও বঞ্চনার শিকার হন তারা।
প্রতিবছরের মতোই এবারও এই ৩ জুলাই ২০২৬ সালে তার ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে রূপসদীতে। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এ দিন সুজনের কবরে শ্রদ্ধা ও দোয়া নিবেদন করেন। তাকে হারানোর শোকে এখনও কাতর পুরো উপজেলাবাসী।
বাংলাদেশের সেরা বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি হাজী মোহাম্মদ মহসিন হল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রাক্তন নির্বাচিত ভিপি। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, বিভিন্ন জায়গায় সফর সঙ্গী নিতেন। তারেক রহমানও তাকে ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। সমসাময়িক নেতৃবৃন্দ, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্খিদের মুখে তার গল্প শোনা যায়।
তিনি ১৯৯৪ সালের উপনির্বাচনে (বিএনপির সাংসদ এটিএম ওয়ালী আশরাফের মৃত্যুর পর) ও ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে (পরপর দুইবার) ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬-বাঞ্ছারামপুর আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০১ সালের ৩রা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্ত্বরের পাশে পাওয়া যায় রূপসদী গ্রামের ক্ষণজন্মা কৃতি সন্তান সুজনের লাশ। আজ ২০২৬ সালেও পাওয়া গেল না তার হত্যাকারীদের আসল পরিচয়, ধোঁয়াশাপূর্ণ তার হত্যাকারীদের ইতিহাস।
জানা যায়, ৩রা জুলাই ২০০১ সালে দলীয় রাজনৈতিক কোন্দলের ফলে আততায়ীর ছুরিকাঘাতে ঢাকায় নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তার স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখার নিমিত্তে ২০০১ সালে ‘সুজন স্মৃতি পরিষদ’ ও ২০০২ সালে সুজন দুলু স্মৃতি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় যা বর্তমানে ‘সুজন স্মৃতি কলেজ’ নামে পরিচিত।
২০০১ সালে তেজগাঁও পুলিশ স্টেশনে দায়ের হয় সুজন হত্যা মামলা, চলতে থাকে তদন্ত। ২০০৩ সালে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি সন্দেহভাজনদেরকে নির্দেশ করে বিচারিক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০০৪ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল অভিযুক্ত আসামী ১. কাজল আহমেদ জালালীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২. ড. রওশন আলম, ৩ হুমায়ুন কবির ওরফে ফুল মিয়া, ৪. জিয়া উদ্দিন ওরফে বায়েস এবং ৫. ইব্রাহিম নুর ওরফে অপু, এই চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্যান্যদেরকে খালাস প্রদান করে রায় প্রদান করে। ২০০৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ অত্র মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করে সকল অভিযুক্তদেরকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন।
সুজন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক ইতিহাস। যে ইতিহাসের পাতা জুড়ে রয়েছে কেবল ভালোবাসা। সুজন বেঁচে থাকবে ততোদিন যতোদিন রবে এই তিতাসের বহমান ধারা।



