অবহেলায় পড়ে থাকা সেই সুমাইয়া এখন পরিচিত টুকটুকি বাউল নামে, সুরে মুগ্ধ লাখো শ্রোতা

সংগীতের সুর আর মাটির গন্ধ মিশে থাকে বাউল গানে। আর সেই সুরের মূর্ছনায় মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সংগীতপিপাসু লাখো মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন তরুণ শিল্পী সুমাইয়া সিকদার, যিনি সবার কাছে ‘টুকটুকি বাউল’ নামে পরিচিত। ফরিদপুর জেলার ইশান গোপালপুর গ্রামের মেয়ে টুকটুকি। তিন বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি।
সংগীতের প্রতি টুকটুকির অগাধ ভালোবাসা ও নিবেদন মূলত পরিবার থেকেই পাওয়া। তার বাবা মো. টোকোন সিকদার ও মা রোজিনা বেগমের স্বপ্ন ছিল, মেয়ে একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই খুব ছোটবেলা থেকে গানের জগতে হাতেখড়ি টুকটুকির।
নিজের শৈশব ও সংগ্রামের দিনগুলো নিয়ে টুকটুকি বাউল বলেন, বাবা-মা আমাকে সবসময় সাহস দিয়েছেন। তবে পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। অনেক রাত মঞ্চের এক কোণে বসে থেকেছি, কিন্তু আয়োজকরা আমাকে গান গাওয়ার সুযোগ দেননি। মঞ্চে বড় বড় শিল্পীদের গান শুনে বারবার মনে হয়েছে, আমিও তো পারি। অপমান আর অবহেলার সেই রাতগুলো আমাকে ভেঙে ফেলার বদলে আরও জেদি করে তুলেছিল। আমি হাল ছাড়িনি, বরং সেই কষ্টগুলোকেই গানের সুরে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মানুষের অবজ্ঞা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে লড়াই করতে হয়।’
গুরু পরম্পরা ও সংগীত সাধনা
তার সংগীত সাধনার পথে প্রথম গুরু ছিলেন নিজামুদ্দিন লালনী। বর্তমানে তিনি তালিম নিচ্ছেন বিশিষ্ট সংগীত গুরু কাজী দলিলুদ্দীনের কাছ থেকে।
শিষ্যার এই অদম্য জেদ ও প্রতিভা নিয়ে গুরু কাজী দলিলুদ্দীন বলেন, টুকটুকির মধ্যে আমি এক অদ্ভুত মায়া দেখেছি। বাউল গান কেবল কণ্ঠ দিয়ে হয় না, এটি হৃদয়ের গভীর থেকে আসে। ওর গানের যে দরদ, তা সহজাত। ও যেভাবে মানুষের অবহেলাকে তুচ্ছ করে গানের প্রতি একাগ্রতা ধরে রেখেছে, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি বিশ্বাস করি, ওর নিষ্ঠা থাকলে সে অনেক দূর যাবে এবং বাউল গানের ধারাকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেবে।”
মেয়ের এমন সাফল্যে গর্বিত বাবা মো. টোকোন সিকদার বলেন, আজ যখন দেখি হাজার হাজার মানুষ টুকটুকির গান শোনার জন্য অপেক্ষা করে, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। আমাদের স্বপ্ন ছিল ও মানুষের ভালোবাসা পাক, আজ ও তা পাচ্ছে। ওর পরিশ্রমই ওকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আমি শুধু দোয়া করি, ও যেন সবসময় মাটির সাথে মিশে থেকে গান গেয়ে যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা
বাউল ও লোকসংগীতে নিজস্ব এক ঢং এবং দরদ দিয়ে গান গেয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার প্রতিটি গানেই যেন ফুটে ওঠে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির আসল রূপ। পড়াশোনার পাশাপাশি গানের চর্চায় নিজেকে যেভাবে নিয়োজিত রেখেছেন, তা সত্যিই বিরল। টুকটুকি ২০২৫ সালে ফরিদপুর ইয়াসিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন।
টুকটুকি বলেন, আমি খ্যাতি চাই না, আমি চাই বাউল গানের অমর সুরগুলো মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখতে। গানেই আমি শান্তি খুঁজি। দর্শকদের ভালোবাসাই আমার পরম পাওয়া।”
এত অল্প বয়সে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া যে কোনো শিল্পীর জন্যই বড় প্রাপ্তি। তরুণ এই বাউল শিল্পীর আগামী দিনের পথচলা আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক—এটাই প্রত্যাশা সবার।