নবীনগরব্রাহ্মণবাড়িয়াশিক্ষা

জনবল সংকটে ধুঁকছে নবীনগর প্রাথমিক শিক্ষা অফিস: চরম দুর্ভোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলমান তীব্র জনবল সংকটের কারণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাবে অফিসের অধিকাংশ কক্ষ তালাবদ্ধ পড়ে থাকছে। অন্যদিকে, ২১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিক্ষক ও প্রায় ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছেন অফিসের হিসাব সহকারী মো. আবু হানিফ। দীর্ঘদিন ধরে একাই প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার ঘাড়ের দুটি রগ ইতোমধ্যে ব্লক হয়ে গেছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, লিভারের সমস্যা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছি। এভাবে আর কিছুদিন চললে মনে হয় অফিস করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।”

তিনি জানান, ২০১২ সালে নবীনগরে যোগদানের সময় অফিসে চারজন কর্মচারী ছিলেন। তখন শিক্ষক সংখ্যা ও কাজের চাপ তুলনামূলক কম ছিল। পরে একে একে সহকর্মীরা অবসরে গেলে বর্তমানে প্রায় দুই বছর ধরে তিনি একাই হিসাব শাখার সব দায়িত্ব পালন করছেন।

তার ভাষায়, “২১৯টি বিদ্যালয়, প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিক্ষক, শতাধিক দপ্তরীসহ প্রায় দেড় হাজার জনবলের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ আমাকে একাই করতে হচ্ছে। এই চাপ আমার স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।”

জনবল কাঠামো অনুযায়ী নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা। বাকি ১০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
এছাড়া উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের তিনটি পদ, অফিস সহায়কের পদসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব প্রশাসনিক পদই শূন্য রয়েছে। করণিক পদও প্রায় দুই বছর ধরে খালি।

বর্তমানে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছুটিতে থাকায় একমাত্র সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মানিক ভূঁইয়া পুরো উপজেলার দায়িত্ব পালন করছেন।

শুধু শিক্ষা অফিসেই নয়, উপজেলার বিদ্যালয় গুলোতেও রয়েছে প্রকট শিক্ষক সংকট। ২১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৬৯টিতে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ১৫০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও প্রায় দেড় শতাধিক পদ খালি রয়েছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম, বিদ্যালয় পরিদর্শন, প্রশাসনিক তদারকি ও শিক্ষার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আটিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে ২১টি ইউনিয়নের ২১৯টি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারকি করা অসম্ভব। অফিসের নানা কাজে শিক্ষকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। অনেক সময় কাজ না হওয়ায় আবার অন্যদিন আসতে হয়। তার ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন দুর্ভোগ তিনি আগে দেখেননি।
গোসাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ তাসলিমা জাহান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট থাকায় প্রশাসনিক কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করা যায় না। একমাত্র কর্মকর্তা মাঠ পরিদর্শনে থাকলে অফিসে এসে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।

শ্যামগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন, আগে অফিসে কয়েকজন করণিক থাকলেও এখন দাপ্তরিক কাজের জন্য চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

আশ্রাফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুদা বেগম বলেন, নবীনগরের ২১টি ইউনিয়ন ও আটটি সাব-ক্লাস্টারের জন্য অন্তত আটজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা প্রয়োজন। অথচ রয়েছেন মাত্র একজন। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মানিক ভূঁইয়া বলেন, গত সাত মাস ধরে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। অফিসে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রতিদিনই নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ২১৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ১৫০টিতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সংসদেও উঠেছে বিষয়টি নবীনগরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এই ভয়াবহ জনবল সংকট ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার বিষয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান। সংশ্লিষ্টদের আশা, দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে শিক্ষা অফিসের কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে।

Related Articles

Back to top button