সংবাদ প্রকাশের পর জুলাইযোদ্ধা আমিরের বাড়িতে ছুটে গেল প্রশাসন, পাচ্ছেন ঘর

‘রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা সেই জুলাইযোদ্ধা আমিরের সংসার চলে গাছ কেটে’ শিরোনামে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কালের কণ্ঠে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আমির হোসেনকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে `দুই পায়ে ছয় গুলি, থামেনি জীবনযুদ্ধ; গাছ কেটে সংসার চালান জুলাইযোদ্ধা আমির’ এ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয় সময়ের বাঞ্ছারামপুরে। সংবাদগুলো প্রকাশের পর পরই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।
এ প্রতিবেদনগুলোর ওপর ভিত্তি করে বুধবার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তারিকুল ইসলাম সোনারামপুর ইউনিয়নের দুলারামপুর গ্রামের প্রত্যন্ত মহল্লায় ছুটে যান।
আমিরের পরিবারের খোঁজখবর নেন ইউএনও। তার ভাঙা ঘর ও শারীরিক অবস্থা দেখে দুঃখ প্রকাশ করে পরিবারের সবাইকে সমবেদনা জানান তিনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করা আমিরকে তাৎক্ষণিক নগদ ১০ হাজার টাকা ও ২ বস্তা খাদ্যপণ্য তুলে দেন।
এসময় ইউএনও ঘোষণা দেন অল্প কিছুদিনের মধ্যে একটি ঘর, বাড়তি টিন ও নিয়মিত মাসিক খাদ্যপণ্য প্রদান করা হবে।
উপহার সামগ্রী পেয়ে তরুণ যোদ্ধা আমির আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
এসময় ইউএনওর সঙ্গে উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কার্যালয়ের কর্মকর্তা প্রকৌশলী মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
ইউএনও মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, তাদের জরাজীর্ণ বসতঘরটিও ঘুরে দেখলাম। ভাঙা বেড়া, নড়বড়ে চাল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাদের জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে।
ফেরার পথে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই পুরোনো দৃশ্য। কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণ। নিচে মৃত্যু, ওপরে গুলি। তবু দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা জীবন।
দুই বছর পর দেখলাম, কার্নিশ বদলেছে, কিন্তু সংগ্রাম বদলায়নি। সেদিন তিনি মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। আজ লড়ছেন জীবন, দারিদ্র্য আর প্রতিকূল সময়ের বিরুদ্ধে। একজন জুলাই যোদ্ধা তরুণ কতটা কষ্টে আছে। তার ভাঙা ঘর মেরামত নয়, নতুন করে গড়ে দেবো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার রামপুরার বনশ্রীতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমিরকে একের পর এক গুলি করেছিল পুলিশ। ৬টি গুলি তার পায়ে লাগে। সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমিরের।
আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আমির হোসেন বলেন, ‘আমি এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। গত কোরবানির ঈদের দিন মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক বিক্রির বিরোধিতা করায় আমার বৃদ্ধ বাবা, বড় ভাই ও আমার ওপর হামলা করে।
উল্লেখ্য, চব্বিশের জুলাইয়ে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলছিল, তখন ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া এলাকায় প্রাণভয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করছেন এক তরুণ।তার দিকে গুলি ছুড়ছে দুই পুলিশ সদস্য। পর পর চালানো হয় কয়েক রাউন্ড গুলি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় ১৯ জুলাইয়ের সেই ফুটেজ। সেখানে পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে এবং ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপ দিতে বলে। আমির অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে পরপর ৬টি গুলি চালায়।
গুলিগুলো তার দুই পায়ের ঊরু, হাঁটু ও গোড়ালি ভেদ করে বেরিয়ে যায়। অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও আমির হোসেনের দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয় তাকে। তার পায়ের হাড় ও মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি নিজের পায়ে ভর দিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেন না। রেস্তোরাঁকর্মী আমিরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করছে সেদিনের ভয়াল স্মৃতি।



