“দুই পায়ে ছয় গুলি, থামেনি জীবনযুদ্ধ; গাছ কেটে সংসার চালান জুলাইযোদ্ধা আমির

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার রামপুরার বনশ্রী এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তরুণ আমির হোসেন এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলেও দুই বছর পর আহত দুই পা নিয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তার।
আমির হোসেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের দুলারামপুর গ্রামের বিল্লাল মিয়ার ছেলে। বর্তমানে তার বয়স ১৯ বছর। তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুই পা পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ভারী কাজ করতে কষ্ট হলেও সংসারের প্রয়োজনে অর্ডার পেলে গাছ কাটার মেশিন নিয়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
আমির বলেন, “আমি এখনও স্বাভাবিক হতে পারিনি। পরিবারের দায়িত্বের কারণে কাজ করতে হচ্ছে। চিকিৎসাও নিয়মিত করাতে পারছি না।”
তিনি অভিযোগ করেন, গত কোরবানির ঈদের দিন এলাকায় মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করায় তার বাবা, বড় ভাই ও তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তবে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে তিনি এ ঘটনায় মামলা করেননি।
আমিরের দাবি, ৫ আগস্টের পর কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও বর্তমানে কেউ তার খোঁজখবর নিচ্ছে না। কয়েক মাস ধরে সরকারি ভাতাও বন্ধ রয়েছে। অর্থসংকটের কারণে চিকিৎসার ফলোআপ করানোও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সরকারের কাছে একটি অটোরিকশা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন, যাতে নিজে আয় করে পরিবারের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করতে পারেন।
এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত অনেককে আমরা বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছি। আমির আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তিনি যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু আমিরের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। তার মতো একজন আহত আন্দোলনকারীর পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
স্থানীয় শিক্ষক সেলিম মিয়া বলেন, “সময়ের সঙ্গে অনেকেই আমিরকে ভুলতে বসেছেন। অথচ তার মতো তরুণদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলন সফল হয়েছিল। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
ভাইরাল সেই ঘটনার পটভূমি
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ঢাকার রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া এলাকায় প্রাণ বাঁচাতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে ছিলেন আমির হোসেন। সে সময় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে তার দুই পায়ে ছয়টি গুলি লাগে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চলতি বছরের জুন মাসে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করেন।



